২০ জুন ২০২৬ , ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ 

জাতীয়

এক বিদ্বেষমূলক অভিযানের ব্যবচ্ছেদ: সমালোচনা নাকি ব্যক্তিগত প্রতিহ

মাহমুদুল হাসান রিকন

প্রকাশিত: ২১:১৯, ১৯ জুন ২০২৬

এক বিদ্বেষমূলক অভিযানের ব্যবচ্ছেদ: সমালোচনা নাকি ব্যক্তিগত প্রতিহ

গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকতার অন্যতম দায়িত্ব হলো ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের সমালোচনামূলক মূল্যায়ন করা। তবে তথ্যনির্ভর সমালোচনা এবং ব্যক্তিগত বিদ্বেষপ্রসূত প্রচারণার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক ও বাংলাদেশের হাইকমিশন, নয়াদিল্লির সাবেক প্রেস মিনিস্টার ফয়সাল মাহমুদের বিভিন্ন লেখা ও মন্তব্য ঘিরে সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে।

নয়াদিল্লিতে কর্মরত অবস্থায় তিনি বাংলাদেশের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু দায়িত্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর তিনি ধারাবাহিকভাবে তাঁর সাবেক কর্মস্থল, হাইকমিশনের নেতৃত্ব এবং কয়েকজন কূটনীতিককে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে সমালোচনা করে আসছেন। সমালোচনা যে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাভাবিক; তবে সেই সমালোচনা কতটা তথ্যভিত্তিক এবং কতটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা অসন্তোষ দ্বারা প্রভাবিত—সেটি বিবেচনার দাবি রাখে।

ফয়সাল মাহমুদের সাম্প্রতিক লেখাগুলোতে বিশেষভাবে বর্তমান হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে অবস্থান লক্ষ করা যায়। তিনি বিভিন্ন নিবন্ধে নেতৃত্বের পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন এবং কূটনৈতিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে এসব মন্তব্যের পক্ষে কতটা প্রামাণ্য তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এক লেখায় তিনি যুক্তি দেন যে, ভারত যেহেতু বাংলাদেশে একজন রাজনীতিবিদকে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে, তাই ঢাকারও উচিত নয়াদিল্লিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও পরীক্ষিত একজন পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত কাউকে পাঠানো। এই যুক্তিকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি আরও দাবি করেন যে, ভারত অতীতে পাকিস্তানের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক মোকাবিলায় ইসলামাবাদে রাজনীতিবিদদের নিয়োগ করেছিল।
এই তুলনার মাধ্যমে তিনি কার্যত সমসাময়িক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ঐতিহাসিকভাবে টানাপোড়েনপূর্ণ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, দুই সম্পর্কের ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা এতটাই ভিন্ন যে এ ধরনের তুলনা বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যার জন্ম দিতে পারে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, নয়াদিল্লিতে দায়িত্ব পালনকালে ফয়সাল মাহমুদের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তাঁর বিদেশ সফর, প্রশাসনিক আচরণ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের ধরন নিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ছিল বলে একাধিক সূত্র উল্লেখ করেছে। যদিও এসব অভিযোগের সবকটির বিষয়ে প্রকাশ্য নথিপত্র পাওয়া যায় না, তবুও সংশ্লিষ্ট মহলে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা ছিল বলে জানা যায়।

গণমাধ্যম কূটনীতির ক্ষেত্রেও তাঁর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একজন প্রেস মিনিস্টারের অন্যতম দায়িত্ব হলো স্বাগতিক দেশের সংবাদমাধ্যম, সম্পাদক ও মতামত-নির্ধারকদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তোলা।সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি এ ধরনের সম্পর্ক তৈরির পরিবর্তে ব্যক্তিগত লেখালেখিতে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ফলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।
পরবর্তীতে তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, প্রশাসনিক কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এর পর থেকেই তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্য ও লেখায় সাবেক কর্মস্থলের প্রতি অসন্তোষের মাত্রা দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পায়।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায়ও দেখা গেছে, কোনো সমন্বয়গত ত্রুটি বা প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিলে তিনি দ্রুত হাইকমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে অনেক ক্ষেত্রেই পরবর্তী তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে যে সংশ্লিষ্ট সমস্যার কারণ ছিল একাধিক পক্ষের সমন্বয়হীনতা বা স্বাগতিক দেশের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।

মাহমুদের দায়িত্ব পালনের বিষয়েও প্রশ্ন ওঠে সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, সে সময় তিনি দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। সরকারি চাকরির নিয়মকানুন মেনে চলা এবং দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার শেষ পর্যন্ত তাঁর চুক্তি নির্ধারিত সময়ের আগেই বাতিল করে।

ফয়সাল মাহমুদের সমালোচনার অধিকার অবশ্যই রয়েছে। তবে কোনো সমালোচনা তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, যখন তা তথ্য, নথি ও যাচাইযোগ্য প্রমাণের ওপর দাঁড়ায়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা অসন্তোষ যদি বিশ্লেষণের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তাহলে তা জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত অবস্থান হিসেবেই প্রতিভাত হয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা হওয়া উচিত। তবে সেই আলোচনা হওয়া দরকার তথ্যভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল উপায়ে। কারণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিরোধ বা বিদ্বেষমূলক বয়ান শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি নয়, বরং প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।