০৪ আগস্ট ২০২৬ , ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ 

জাতীয়

বহাল আওয়ামী আমলের সিএজি, ক্ষোভে স্থবির নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

প্রকাশিত: ১২:০৯, ৩ আগস্ট ২০২৬

বহাল আওয়ামী আমলের সিএজি, ক্ষোভে স্থবির নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগ

গত শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন

বিতর্কিত ব্যক্তিদের পদোন্নতি ও পদায়ন এবং কার্যক্রমে বিগত আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগীদের প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের অধীন বিভিন্ন অধিদপ্তর ও কার্যালয়ে অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করেছে।

‎সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে এখনো বহাল রাখা, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিত এক সেনা কর্মকর্তার মেয়েকে পদোন্নতি দেওয়া এবং পদোন্নতি-পদায়নে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠান জুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রভাব দাপ্তরিক কার্যক্রমেও পড়ছে বলে দাবি তাদের।



এ দিকে গত শনিবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মোহাম্মদপুর থানায় ছাত্র হত্যা মামলার আসামি ও কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিট জেনারেল (সিএজি) নূরুল ইসলামের অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন করেছে সচেতন নাগরিক ফোরাম।

‎এসব বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার।

‎সিএজি বাংলাদেশের সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন সর্বোচ্চ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান। সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এ কার্যালয়ের অধীন ১৭টি অডিট অধিদপ্তর নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। সিএজির অধীনে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের (সিজিএ) কার্যালয়সহ ৫০টি প্রধান হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তার (সিএএফও) কার্যালয়, আটটি বিভাগীয় হিসাবরক্ষণ অফিস, ৬৪টি জেলা হিসাবরক্ষণ অফিস, ৪৯৫টি উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস, কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স (সিজিডিএফ), সিনিয়র ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার (এসএফসি), বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অর্থ) এবং বিভিন্ন সেনানিবাসের এরিয়া ফাইন্যান্স অফিস রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার।



‎সূত্র জানায়, গত ৩০ জুন ১৯ জন কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত উপ-মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সমমান) পদে পদোন্নতির আদেশ জারির পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসন্তোষের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। পদোন্নতিপ্রাপ্তদের তালিকায় ২৪ তম বিসিএসের কর্মকর্তা নাশিদ নওয়াজেশের নাম রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় সামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা কর্নেল নওয়াজেশ উদ্দিনের মেয়ে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর বিভিন্ন কার্যালয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

‎এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নাশিদ নওয়াজেশ কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। প্রতিবেদকের প্রশ্ন শুনে তিনি মোবাইলের সংযোগ কেটে দেন।

‎সূত্রের দাবি, নাশিদ নওয়াজেশ ছাড়াও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল—এমন কয়েকজন কর্মকর্তাও পদোন্নতি পেয়েছেন।

‎অভিযোগ উঠেছে, পদায়ন ও নিরীক্ষা কার্যক্রমে কে কোথায় যাবে তা এখনো নিয়ন্ত্রণ করছেন গোপালগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মাহমুদুল হাসান মামুন নামের এক হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা। আর এতে প্রচুর অর্থের লেনদেন হয়। এ ছাড়া সিএজি অফিসের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার আসামি ২৭ তম বিসিএসের কর্মকর্তা জি এম মামুনুর রশিদ এবং শাহজাহান সিরাজ নামের ২৮ তম বিসিএসের কর্মকর্তা, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। মূলত আওয়ামী সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই হিসাব ও বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করেন সিএজি নুরুল ইসলাম।

জি এম মামুনুর রশিদ, শাহজাহান সিরাজ এবং মাহমুদুল হাসান মামুন
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানান, হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান মামুনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠলে তাকে প্রথম গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে বদলি করা হয়। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল অর্থের বিনিময়ে আবার প্রথমে ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট একাডেমি (ফিমা) এবং স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তর বদলি করা হয়।

তারা আরও বলেন, পিরোজপুরে ১ হাজার ৬০০ কোটির টাকার নিরীক্ষায় বড় ধরনের অনিয়ম করেছে মাহমুদুল হাসান মামুন। যা পরবর্তীতে সিএজি অফিসের বিশেষ নিরীক্ষায় ধরা পড়েছে।

‎জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট সিএজি নূরুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে তাঁর কার্যালয়ে বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে তিনি পদত্যাগ করবেন বলে আশ্বাস দিয়ে কার্যালয় ত্যাগ করেন। পরে প্রায় তিন মাস পর তিনি ফিরে এসে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

‎সিএজি একটি সাংবিধানিক পদ। নূরুল ইসলাম ২০২৩ সালের ১৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির আদেশে সিএজি হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি অষ্টম বিসিএসের কর্মকর্তা এবং ১৯৮৯ সালে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডারে যোগ দেন।

‎জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত দশ কর্মকর্তা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে নিয়োগ পান নূরুল ইসলাম। তিনি নিয়োগ পাওয়ার পরই নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগকে আওয়ামী করণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এর অংশ হিসেবে এ কার্যালয়ের অধীন সব দপ্তরে মুজিব কর্নার প্রতিষ্ঠা ও সিএজি চত্বরে ম্যুরাল নির্মাণ করেন। একই সঙ্গে ঘন ঘন টুঙ্গিপাড়া ও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যেতে সব কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিতেন।

‎তারা আরও বলেন, ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর ভোল পাল্টে ফেলেন নূরুল ইসলাম। নিজেকে পরিচয় দেন এক বিশেষ এলাকার লোক এবং এক প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয় হিসেবে।


‎ইতিপূর্বে দায়িত্ব পালন করা একজন সাবেক সিএজি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, সাধারণত সরকারের আস্থাভাজন ব্যক্তিরাই সিএজির মতো সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালন করেন। কেন এখনো ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের নিয়োগ করা ব্যক্তিকে বহাল রাখা হয়েছে তা বোধগম্য নয়।

‎তিনি আরও বলেছেন, আগে কোন সিএজির পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেনি। এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন।

‎এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল নম্বরে ফোন ও এসএমএস করলেও সাড়া দেননি সিএজি নূরুল ইসলাম। পরে একাধিকবার তাঁর দপ্তরে গিয়েও দেখা পাওয়া যায়নি। গতকাল শনিবার দুপুরে তার সহকারী একান্ত সচিব হাসান মাহমুদ এ প্রতিবেদককে ফোন করে বলেন, ‘স্যার অসুস্থ, তাই আমাকে কথা বলার দায়িত্ব দিয়েছেন’।

‎সব অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে আপনি অর্থ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করুন।’

‎দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, তিনি আপাতত কোনো মন্তব্য করবেন না। এ বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া হবে।