১৯ জুলাই ২০২৬ , ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ 

জাতীয়

অভিযোগের পাহাড় পেরিয়ে পররাষ্ট্রসচিবের দৌড়ে? 

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

প্রকাশিত: ১৮:৩৩, ৩ জুন ২০২৬

অভিযোগের পাহাড় পেরিয়ে পররাষ্ট্রসচিবের দৌড়ে? 

বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল ও সংস্কারের আলোচনা জোরালো হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ—পররাষ্ট্রসচিব—নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। 

বর্তমান পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে তাদের মধ্যে ব্রাজিলে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. তৌহিদুল ইসলামের নাম সামনে আসায় কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। 

সমালোচকদের প্রশ্ন, অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্কের প্রেক্ষাপটে দেশের কূটনীতির সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে তাঁকে বিবেচনা করা কতটা যুক্তিযুক্ত। 

মিলান কেলেঙ্কারি
কূটনৈতিক পেশায় ব্যক্তিগত সততা, নৈতিকতা এবং পেশাদার আচরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, তৌহিদুল ইসলামের কর্মজীবনের একটি অধ্যায় এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। 
২০১৩ সালে ইতালির মিলানে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে এক নারী সহকর্মী মানসিক হয়রানি, যৌন হয়রানি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তাঁকে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় প্রত্যাহার করা হয়। 

পরবর্তীতে মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র প্রতিবাদের মুখে তাঁকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করা হলেও, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হওয়ার সুবাদে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। 

অস্ট্রিয়া বিতর্ক
২০২৩ সালে তৌহিদুল ইসলামকে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু তাঁর অতীত নৈতিক স্খলনের রেকর্ড খতিয়ে দেখে অস্ট্রিয়া সরকার তাঁকে 'অ্যাগ্রিমো' দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন ব্যক্তিগতভাবে অস্ট্রিয়ার ইউরোপীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রী আলেকজান্ডার শ্যালেনবার্গকে চিঠি লিখে অনুরোধ করলেও ভিয়েনা তাদের অবস্থানে অনড় থাকে। 

বিতর্ক রয়েছে সিঙ্গাপুর মিশনেও
সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তৌহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এবং তাঁর স্ত্রীর রূপচর্চা, স্পা এবং বিধি-বহির্ভূত সৌন্দর্যবর্ধন সংক্রান্ত চিকিৎসার নামে ভুয়া মেডিকেল বিল ও ভাউচার দাখিল করে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে প্রায় ৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। 
 
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও জনমতের প্রত্যাশা 
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের বৈদেশিক স্বার্থ রক্ষা, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং বহুমাত্রিক কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পররাষ্ট্রসচিবের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত নেই। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, পররাষ্ট্রসচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু জ্যেষ্ঠতা নয়, ব্যক্তিগত সততা, পেশাগত দক্ষতা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বিতর্কমুক্ত ভাবমূর্তিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তাই সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন—পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার কি বিতর্কিত অতীতের অভিযোগগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করবে, নাকি নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেবে? এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতে দেশের কূটনৈতিক নেতৃত্ব সম্পর্কে জন আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে পারে।