রাজধানীর সরকারি বাংলা কলেজে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণকাজ ছিল দুটি। এ দুটি কাজই অবৈধভাবে দেওয়া হয় তৎকালীন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন নিখিলের ক্যাশিয়ারখ্যাত যুবলীগের প্রচার সম্পাদক মিরন এন্টারপ্রাইজকে। আর এতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় চার বছর ঢাকায় চাকরি করা রাজশাহী যুবলীগের সেক্রেটারি আসাদের ভাই এবং বর্তমান ঢাকার ১৩ জেলার নিয়ন্ত্রণকারী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান ও ঢাকা মেট্রোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং সচিবালয়ে ঘুষকাণ্ডে আলোচিত মো. হাসান শওকত।
সূত্র বলছে, এ কাজ দুটি বাস্তবায়ন হয়েছে আলাদা সময়ে। এ কাজ বাবদ হাসান শওকত মিরন এন্টারপ্রাইজ থেকে একটি প্রিমিও গাড়ি নেন। বিনিময়ে তিনি তাদের ফাইনাল বিল ও অভিজ্ঞতার সনদ দেন, যা যুবলীগ নেতা মিরন নিজেই স্বীকার করেছেন। ছাত্রজীবনে কুয়েট হল শাখার জামায়াতের সাথী সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ও বর্তমান এসি হাসান শওকত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে তিন বছর ঢাকা মেট্রোর নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। তাঁর দায়িত্ব পালনকালে অনেক ঠিকাদারকে কাজ না করেই বিল দেওয়া হয়েছে এবং অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর এখন আবার হাসান শওকত নিজেকে বিএনপিপন্থী দাবি করছেন।
সূত্র আরও বলছে, হাসান শওকত আওয়ামী সরকারের দোসর হাওলাদার এন্টারপ্রাইজকে খিলগাঁও এলাকার দাসেরকান্দি দারুস সুন্নাহ মাদ্রাসার কাজ শেষ না করেই ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার বিল ও জামানত দিয়ে দেন। যে কাজ এখনো শেষ হয়নি। এ ছাড়া খিলগাঁও গভর্নমেন্ট স্টাফ কোয়ার্টার হাই স্কুলের ১ কোটি ২২ লাখ টাকার বিল ও জামানত দিয়ে দেন যুবলীগের লতিফ করপোরেশনকে। তারা দুজন মিলে যে কাজ এখনো শেষ করেনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুই আলোচিত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ঢাকা মেট্রো ও ঢাকা বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করে জামায়াত ও আওয়ামী দোসরদের অবৈধ সুবিধা দিচ্ছেন। এতে বঞ্চিত হচ্ছেন সরকারদলীয় ও নিরপেক্ষ ঠিকাদারেরা।
সূত্র আরও বলছে, রাজধানীর সরকারি বাংলা কলেজের সীমানাপ্রাচীরসহ রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের জন্য প্রথম ধাপে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা সরকারি অর্থ বরাদ্দ করা হয়। প্রথমবার দরপত্র আহ্বান করলে কাজ পান মেসার্স মিরন এন্টারপ্রাইজ। দরপত্র দলিলে দেখা যায়, কাজটি পাথরের ঢালাই দিয়ে সম্পন্ন করার কথা, কিন্তু তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আক্তারুজ্জামান অবৈধ লেনদেন করে পাথরের পরিবর্তে ইটের খোয়া দিয়ে ঢালাই কাজ সম্পন্ন করেন। এ বিষয়ে সে সময় কলেজ কর্তৃপক্ষ বাধা দিলে আওয়ামী লীগের প্রভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

একই কাজের বাকি অংশ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আবারও ২ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। আবারও দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং সেই একই চক্র কাজটি হাতিয়ে নেয়। আগের মতোই পাথরের পরিবর্তে ইটের খোয়া দিয়ে কাজটি বাস্তবায়ন করা হয়। এই বিষয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হলে আক্তারুজ্জামান তাঁর ভাই রাজশাহী যুবলীগের সেক্রেটারি আসাদের সহায়তায় মন্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে দেখা করে সেই যাত্রায় নিজেকে সেইফ করে নেন।
দুটি কাজ পুরোপুরি আলাদা দরপত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হলেও পরবর্তী নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকত অনৈতিক সুবিধা নিয়ে দুটি কাজকে একটি কার্যসম্পাদন সনদ বানিয়ে দেন। এতে করে মেসার্স মিরন এন্টারপ্রাইজ সারা বাংলাদেশে যত কাজের টেন্ডার হয়, তার সবগুলোতেই অংশ নিয়ে কাজ পায়।
রাজশাহীর সাবেক মেয়র খাইরুজ্জামান লিটনের ডান হাত, রাজশাহী মহানগর আওয়ামী যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদের বড় ভাই, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম মো. আক্তারুজ্জামান এখন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অঘোষিত সম্রাট হয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগের সময় ডা. দীপু মনির আস্থাভাজন হিসেবে তিনি ঢাকা জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। শিক্ষার সাবেক অঘোষিত সম্রাট ঠিকাদার শফিকের সঙ্গে যোগসাজশ করে ঢাকা শহরের প্রায় ১০টি ভবন নির্মাণের টাকা তুলে ভাগবাটোয়ারা করে খেয়ে ফেলেন। অগত্যা বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। ছোট ভাই যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে মেয়র লিটনকে দিয়ে সেই বিভাগীয় মামলা ডিসমিস করে নেন।
'২৪-এর জুলাই আন্দোলনে স্বৈরাচার হাসিনা পালিয়ে গেলে নিজের খোলস পাল্টে ফেলেন। নিজের আপন ছোট ভাই পালিয়ে থাকলেও হুট করে নিজে হয়ে যান ক্ষমতাধর ব্যক্তি। প্রধান প্রকৌশলীর প্রস্তাব ছাড়াই ক্ষমতার দাপটে বাগিয়ে নেন ঢাকা বিভাগের প্রধানের পদ। এখানে বসে সরকারবিরোধীদের মিটিং-মিছিলে ছোট ভাই যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদের মাধ্যমে অঢেল টাকা দিয়ে যাচ্ছেন। এমন একজন আওয়ামী লীগের নেতা ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত থেকে ১৩ জেলার বিভিন্ন নির্বাহী প্রকৌশলীকে চাপ দিয়ে আওয়ামী ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিচ্ছেন।
সূত্র বলছে, ২ কোটি ৬ হাজার ১২১ টাকার সরকারি বাংলা কলেজের দেয়াল নির্মাণকাজ করেছে মেসার্স মিরন এন্টারপ্রাইজ। এ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী রাকিব হোসেন মিরন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ঢাকা মহানগর যুবলীগের (উত্তর) প্রচার সম্পাদক। এ প্রতিষ্ঠানকে অবৈধভাবে অনৈতিক সুবিধা দিয়েছেন ঢাকা মেট্রোর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম মো. আক্তারুজ্জামান ও মো. হাসান শওকত।
সূত্র আরও বলছে, ঢাকা মেট্রোর দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন দুই নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম মো. আক্তারুজ্জামান ও মো. হাসান শওকত দরপত্র ও নির্মাণকাজ তদারকিতে ভয়াবহ অনিয়ম করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এই দুজনই দুটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সমর্থক। এর মধ্যে আক্তারুজ্জামানের ভাই রাজশাহী যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আর হাসান শওকত জামায়াতে ইসলামীর রোকন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
নথিপত্র বলছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার পশ্চিম ইউসুফ উচ্চ বিদ্যালয়ে কোনো কাজ না করেই ঠিকাদারকে ১০ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়। একইভাবে উত্তরখান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা, মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ লাখ টাকা এবং দাশেরকান্দি দারুচ্ছুন্নাহ আলিম মাদ্রাসার কাজে ১০ লাখ টাকা অগ্রিম বিল দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সময় হাসান শওকত ঢাকা মেট্রোর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
ঢাকার বাইরে বঞ্চিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে এক নির্বাহী প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, তারা দুজনই আমার বস। কী আর বলব! আমাকে অর্ডার করে নানা ধরনের চাপ দিয়ে তাদের কথা শুনে কাজ না করেই বিল দিতে বাধ্য করেছে। আমাকে বিভাগীয় মামলাও খেতে হয়েছে।
বিএনপির ঠিকাদারেরা বঞ্চিত হয়ে হতাশা প্রকাশ করে গণমাধ্যমের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে হাসান শওকত ও আক্তারুজ্জামান ফোন রিসিভ করেননি।



