পাঠ্যক্রমকে সফটওয়্যারের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে যা গতিশীল, অভিযোজনযোগ্য এবং নিরন্তর পরিবর্তনশীল। সফটওয়্যারের মতোই, পরিবর্তনশীল চাহিদা ও প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে একে নতুন করে ডিজাইন, হালনাগাদ এবং প্রয়োজনমতো পরিবর্তন করা যায়।
অন্যদিকে, শিক্ষা ব্যবস্থার “হার্ডওয়্যার”-এর মধ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং বৃহত্তর সমাজ। শিক্ষাগত “সফটওয়্যার” (পাঠ্যক্রম) তৈরির সময়, “হার্ডওয়্যার” অর্থাৎ যে অবকাঠামো এবং বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে এটি পরিচালিত হয় তার সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এই ধরনের সামঞ্জস্য ছাড়া, এমনকি সবচেয়ে উন্নত পাঠ্যক্রমও তার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল প্রদানে ব্যর্থ হতে পারে।
বাংলাদেশের শিক্ষার অবকাঠামোগত বাস্তবতা
বাংলাদেশে, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই যোগ্যতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। শ্রেণিকক্ষগুলো প্রায়শই বড় আকারের (জনাকীর্ণ) হয় এবং ভৌত পরিবেশ আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতির জন্য সহায়ক নয় এমনকি কখনো কখনো ন্যূনতম মানও পূরণ করে না।
শিক্ষকেরা, বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরে, উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন। তাদের ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখবে এমন কোনো রাষ্ট্রীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নেই। উল্লেখ্য মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশে একটিও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নেই! শিক্ষকতার জন্য লাইসেন্স ব্যবস্থা নেই এবং এটি বাধ্যতামূলকও নয়, এবং একবার নিয়োগপ্রাপ্ত হলে একজন শিক্ষক সাধারণত তাদের পেশাগত দক্ষতার পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন ছাড়াই আজীবন এই পেশায় থেকে যান। অধিকন্তু, ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন (CPD)-এর মতো বাধ্যতামূলক বা কাঠামোগত প্রশিক্ষণের কোনো পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নেই। বেশির ভাগ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিই প্রকল্প-ভিত্তিক, ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে এবং এগুলো পেশাগত উন্নতি বা পদোন্নতি কিংবা প্রণোদনার সঙ্গে যুক্ত নয়।
এ ছাড়া, শিক্ষকদের স্বায়ত্তশাসনের অভাব রয়েছে। শিক্ষাদান সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ দ্বারা নির্ধারিত হয় এবং শিক্ষকদের তাদের শিক্ষণ পদ্ধতির ওপর সীমিত প্রভাব থাকে। কম বেতন, সঠিক জবাবদিহি এবং যথাযথ স্বীকৃতির অভাব শিক্ষকদের এইরকম পেশাগত দক্ষতা অর্জনে আরও নিরুৎসাহিত করে, যার ফলে তাদের পক্ষে পেশার প্রতি মনোনিবেশ করা এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানান্তর ও শেখার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রতিবন্ধকতা
শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব কিছু প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। যারা প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক শিক্ষায় স্থানান্তরিত হয়, তারা প্রায়শই পাঠ্যক্রমে একটি আকস্মিক পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়। অভিজ্ঞতামূলক শিক্ষা থেকে আরও কঠিন এবং অপরিচিত একটি কাঠামোর দিকে। এটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং তাদের শেখার ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করে।
অধিকন্তু, শিক্ষার্থীদের এখন অনলাইন রিসোর্সের ব্যাপক সুবিধা থাকলেও, এই তথ্যগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করার জন্য তাদের সঠিক নির্দেশনার অভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানাবিধ পরিস্থিতিতে স্কুল বন্ধ থাকার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শেখার সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা তাদের পড়াশোনার অগ্রগতিকে প্রভাবিত করেছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে শেখার বিভিন্ন ক্ষমতা প্রায়শই উপেক্ষিত হয়, কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি নির্ধারণ করা হয়নি। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং সুযোগ এর অভাব রয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের মধ্যে থাকা এই মেধাগত ভিন্নতাগুলোকে সমন্বয় করার জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি শিখন পদ্ধতির প্রয়োজন।
উপরন্তু, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বিষয়ে যথাযথ নীতিমালা প্রণীত না হওয়ায় একদিকে যেমন শিক্ষার্থীরা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এর ব্যবহার করছে একই সঙ্গে এর নৈতিক প্রায়োগিক উপযোগিতা সম্পর্কে থেকে যাচ্ছে উদাসীন। অথচ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন শিখন-শেখানো কার্যক্রমকে সত্যিকারভাবে ফলপ্রসূ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক স্তরের ঘাটতি
বাংলাদেশের বেশির ভাগ স্কুল দুর্বল অবকাঠামোর কারণে ভুগছে যেমন সীমিত জায়গা, অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, পাঠ্যক্রম-বহির্ভূত (সহ-পাঠ্য ক্রমিক) কার্যক্রমের অপ্রতুলতা বা সমন্বয়হীনতা এবং যোগ্য শিক্ষকের অভাব। পরিচালন বাজেট সীমিত এবং স্কুলের অবস্থান নির্ধারণের জন্য কোনো কৌশলগত পরিকল্পনা নেই অথবা থাকলেও প্রশাসনিক দুর্নীতির কারণে তা মানা হয় না। কিছু শহরাঞ্চলে স্কুলগুলো ঘনবসতিপূর্ণ, অথচ প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো এই সেবা থেকে বঞ্চিত।
স্বাস্থ্যবিধি, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং নৈতিক বা চারিত্রিক বিকাশের মতো মৌলিক পরিষেবাগুলো প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে। শিক্ষাক্ষেত্রে স্থানীয় সমাজ ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণও দুর্বল। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদ প্রায়শই প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তিগত লাভকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়। অনেক সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি একটি শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য অনুকূল নয়। অথচ স্থানীয় সমাজ এর প্রতিনিধিদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত ও কার্যকর অংশগ্রহণ এর মাধ্যমে সঠিক জবাবদিহীতা ও শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব।
অভিভাবকদের ভূমিকা
অনেক অভিভাবক, বিশেষ করে নিম্ন-আয়ের বা অশিক্ষিত পরিবার থেকে আসা অভিভাবকরা, তাদের সন্তানদের শিক্ষায় কার্যকরভাবে সহায়তা করতে পারেন না। সন্তানের সামগ্রিক বিকাশের পরিবর্তে, সাফল্য সম্পর্কে তাদের ধারণা প্রায়শই কেবল গ্রেড বা সার্টিফিকেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আর্থিক সীমাবদ্ধতাও অনেককে তাদের সন্তানদের স্কুল থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করে, বিশেষ করে যখন শিক্ষার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
যথেষ্ট সরকারি সহায়তার অভাবে, বেসরকারি স্কুলগুলো এই শূন্যস্থান পূরণ করেছে। তবে, এই স্কুলগুলোর ওপর সরকারি তদারকি প্রায়শই নগণ্য থাকে, যার ফলে জাতীয় শিক্ষা নীতিমালার প্রতি তাদের আনুগত্যে অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়। আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে যে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা, অবকাঠামো, প্রশিক্ষণসহ নানাবিধ সুবিধা সরকারিভাবে প্রদান করা হলেও তাদেরকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বলা হচ্ছে এবং তাদেরকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে জবাবদিহীতার আওতায় আনা যাচ্ছে না।
ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা: পাঠ্যক্রম সংস্কারে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি
এইসব পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতার পরিপ্রেক্ষিতে, জরুরি প্রশ্নটি হলো: বাংলাদেশ কোন ধরনের পাঠ্যক্রম গ্রহণ করবে? এক্ষেত্রে বলা যায়, এর ভিত্তি হতে হবে একটি ব্যাপক ও যুগোপযোগী শিক্ষা নীতিমালা। সর্বশেষ নীতিমালাটি ২০১০ সালের এবং সেটিও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। একটি নতুন নীতিমালায় অবশ্যই বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জাতীয় এবং বৈশ্বিক চাহিদার প্রতিফলন থাকতে হবে। এবং এর সাথে শিক্ষা আইনও যুক্ত হওয়া উচিত, যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। আর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করা যেটি দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত প্রদান করবে এবং এর পরামর্শের আলোকে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া সমীচিন হবে।
মূল কী পদক্ষেপগুলো হতে পারে?
• জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং ভৌগোলিক চাহিদার ভিত্তিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিন্যাস করা এবং প্রয়োজনে বিদ্যালয় একীভূত করা বা নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা এবং পর্যাপ্ত দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক নিয়োগ করা।
• পাঠ্যক্রম সংস্কারের আগে সমস্ত বিদ্যালয়কে একটি ন্যূনতম মানে উন্নীত করার মাধ্যমে শিক্ষায় সমতা নিশ্চিত করা। (প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন স্বাস্থ্যকর্মী ও একজন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নিয়োগ প্রদান আবশ্যক)
• চাহিদা ও সরবরাহের মূল্যায়ন করা এবং সমস্ত বিদ্যালয়ের মধ্যে সম্পদের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা।
• স্থানীয় সমাজ ও শিক্ষার্থীদেরকে কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্বায়ত্বশাসন প্রদানের মাধ্যমে ক্ষমতায়িত করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
• সকল শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার (মাস্টার্স ডিগ্রী) প্রয়োজন নেই, এই বিষয়টি উপলব্ধি করে এবং শিক্ষার পথকে ব্যক্তিগত সক্ষমতা ও রাষ্ট্রের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
একটি সহায়ক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করার পরেই আমাদের নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত হবে।
• পাঠ্যক্রমের বিষয়বস্তু, শিক্ষার ক্ষেত্র এবং বিষয়সমূহের পুনর্গঠন। (যেমন: প্রতিষ্ঠিত শিল্প উদ্যোক্তা দ্বারা কারিগরি শিক্ষাক্রম প্রস্তুত করা)
• প্রণীত শিক্ষাক্রমের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ বরাদ্দ করা।
• শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষণ পদ্ধতি এবং মূল্যায়ন কৌশল তৈরি করা।
• সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থাপনা সিস্টেম সফটওয়্যার অর্থাৎ Comprehesive Learning Management System (CLMS) তৈরি করা।
• সায়েন্স, টেকনলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং, কলা ও গণিত (STEAM) মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠার বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা।
আমাদের পাঠ্যক্রমকে অবশ্যই ভবিষ্যৎমুখী হতে হবে। বিশ্ব যখন পঞ্চম শিল্প বিপ্লবের দিকে এগিয়ে চলেছে এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর মতো প্রযুক্তি সমাজকে নতুন রূপ দিচ্ছে, তখন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে অবশ্যই শিক্ষার্থীদের শুধু যোগ্যতা দিয়েই নয়, বরং মানবিকতা ও নৈতিকতার একটি শক্তিশালী ভিত্তি দিয়েই প্রস্তুত করতে হবে।
সর্বোপরি, শিক্ষা শুধু জ্ঞান ও দক্ষতা প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয় এটি একটি রূপান্তরমূলক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত যা শিক্ষার্থীদের সক্ষম, সহানুভূতিশীল এবং দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি
ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, গাজীপুর।



