০৬ অক্টোবর ২০২৬ , ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ 

জাতীয়

মেহেরপুর শিক্ষা প্রকৌশলে অনিয়মের পাহাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

প্রকাশিত: ১৯:৪৬, ৫ অক্টোবর ২০২৬

মেহেরপুর শিক্ষা প্রকৌশলে অনিয়মের পাহাড়

মেহেরপুর জেলার শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ইইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল আহসানের বিরুদ্ধে দরপত্র মূল্যায়নে অনিয়ম-কাজের দর ফাঁস, কাজের মেয়াদ বাড়ানো ও বিল ছাড়ে অর্থ দাবিসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাঁর বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশও দিয়েছে। 

সূত্র বলছে, গত বছরের ১৩ অক্টোবর মেসার্স সৈকত এন্টারপ্রাইজ, কুষ্টিয়ার পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. রেজাউল করীম রাকিবুল আহসানকে লিগ্যাল নোটিশ দেন। নোটিশে বলা হয়, গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর মেহেরপুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যালয় থেকে তিনটি দরপত্র আহ্বান করা হয়। এসব দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পিপিআর ২০০৬ ও ২০০৮ এবং সিপিটিইউর আদর্শ দরপত্রে উল্লেখ নেই—এমন কিছু মূল্যায়ন-নির্ণায়ক ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। এতে দরপত্রের সব শর্ত পূরণ করেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কাজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। 

লিগ্যাল নোটিশে অভিযোগ করা হয়, দরপত্র মূল্যায়নে বিধিবহির্ভূত শর্ত বা নির্ণায়ক ব্যবহার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। নোটিশে এসব অনিয়মের মাধ্যমে করা কার্যক্রম বাতিল না করলে প্রচলিত আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়। আইনজীবী রেজাউল করীম বলেন, তাঁর মক্কেলকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে বলেই লিগ্যাল নোটিশ দেওয়া হয়েছে। 

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার মো. রাকিবুল আহসানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। 

এদিকে রাকিবুলের বিরুদ্ধে ফার্নিচার ক্রয়ের একটি ওপেন টেন্ডার নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। সূত্র বলছে, সাতটি গ্রুপের এ টেন্ডারে ১০ জন ঠিকাদার অংশ নেন। অভিযোগ রয়েছে, সাতটি গ্রুপের কাজ পাঁচজন ঠিকাদারের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। নির্বাচিত কয়েকজন ঠিকাদারের অনুরূপ কাজের অভিজ্ঞতা বা ‘সিমিলার ওয়ার্ক’-এর কাগজপত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে কাজ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। 

একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, রাকিবুল আহসানের সঙ্গে কিছু ঠিকাদারের যোগসাজশ রয়েছে। তাঁদের দাবি, দরপত্রের গোপন মূল্য বা রেট শিডিউল ফাঁস করে কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। গাংনীর ঠিকাদার রানা অভিযোগ করেন, কাজের মেয়াদ বাড়ানো এবং বিল পেতে তাঁকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে। টাকা না দিলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও তাঁর অভিযোগ। 

এ ছাড়া রাকিবুল আহসানের বিরুদ্ধে অনিয়মিত অফিস করা এবং ঠিকাদারদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। কয়েকজন ঠিকাদার তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন একই এলাকায় কর্মরত থাকার সুযোগ নিয়ে প্রভাববলয় তৈরির অভিযোগ করেছেন। এসব অভিযোগের কোনোটি আদালত বা সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। 

রাকিবুল আহসানের কর্মস্থল বদল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ১৬ অক্টোবর ২০২৫-এর বদলি আদেশে তাঁকে মেহেরপুর থেকে যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়। একই আদেশে যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাদিউজ্জামানকে প্রধান কার্যালয়ে এবং কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলামকে মেহেরপুরের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে বদলি আদেশ কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী হাদিউজ্জামান প্রধান কার্যালয়ে যোগ না দেওয়ায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মেহেরপুর থেকে বদলি হওয়া রাকিবুল আহসানের যশোরে যোগদান আটকে যায়। 

রাকিবুল আহসানের আগের কর্মস্থল চাঁপাইনবাবগঞ্জেও তার বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে দরপত্র ভাগাভাগি ও কমিশনের বিনিময়ে কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। পরে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে মেহেরপুরে বদলি করা হয়। 

এ ছাড়া ২০২৪ সালের একটি নির্মাণকাজ নিয়েও মেহেরপুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। জানা যায়, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ তিন বছরেও শেষ হয়নি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ৩২ লাখ টাকা তুলে নিয়ে কাজ অসমাপ্ত রেখেছে। ওই ঘটনায় নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল আহসান এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। 

সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ইইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, মেহেরপুর জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

(প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব আসছে)